কাজী সাব্বির আহমেদ দীপু
প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে জেলার ২২৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
◾ ভারপ্রাপ্ত দিয়েই চলছে কার্যক্রম
◾ মান সম্মত পাঠদানে বঞ্চিত শিক্ষার্থীরা
◾ উদ্বিগ্ন ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৭৮ জন শিক্ষার্থীর অভিভাবক
মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ে ৭৬টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩১ টি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য। আর জেলার
৬টি উপজেলার ৬১০ টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২২৬ টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে। গত ৫ বছরের বেশী সময় ধরে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়েই চলছে প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম। আর ভারপ্রাপ্ত ও অস্থায়ী দায়িত্বপ্রাপ্তরা বিদ্যালয় পরিচালনা করায় শিক্ষা পরিষেবা ও পাঠদানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বর্তমানে একদিকে ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান কার্যক্রমসহ শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, অপরদিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থায় বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।
এ নিয়ে চলতি বছরের ১৪ মার্চ দৈনিক মুন্সীগঞ্জের সময় পত্রিকায় প্রধান শিরোনামে নিউজ প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু ৬ মাস পেরিয়ে গেলেও কেনো পরিবর্তন হয়নি। এখনও ২২৬টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ এখনও শূন্য রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দীর্ঘ ৫ বছরের বেশী সময় ধরে মুন্সীগঞ্জ জেলার ৬টি উপজেলাধীন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলোতে শিক্ষক সঙ্কটের কারণে প্রয়োজনীয় নেতৃত্ব ও তদারকির অভাব তৈরি হয়েছে। প্রধান শিক্ষক না থাকায় পরিকল্পিত পাঠদান, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং অভিভাবক-শিক্ষক যোগাযোগ সবই দুর্বল হয়ে পড়েছে। এসব কারণে অনেক বিদ্যালয়ে পাঠদানের মান কমতে শুরু করেছে এবং অভিভাবকরাও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, ৬টি উপজেলায় মোট ৬১০ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মধ্যে ২২৬ টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। তার মধ্যে মুন্সীগঞ্জ সদরে ১১৫টি স্কুলের মধ্যে ৫১ টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। টঙ্গীবাড়িতে ৯২টি স্কুলের মধ্যে ২৯ টি বিদ্যালয়ে , সিরাজদীখানে ১২৮ টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৪০ টি বিদ্যালয়ে, লৌহজংয়ে ৭৬টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩১ টি বিদ্যালয়ে, শ্রীনগরে ১১২টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৪০ টি বিদ্যালয়ে, গজারিয়ায় ৮৭ টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৫ টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকে নেই। সব মিলিয়ে পুরো জেলায় ২২৬টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন ৩৮৪ জন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলায় ৬১০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৭৮ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। শিক্ষার হার ৯২ শতাংশ হলেও শিক্ষক সংকট শিক্ষার মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
সদর উপজেলার চরবেহেরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক অভিভাবক অভিযোগ করে বলেন, “আমাদের বাচ্চারা ঠিক মতো ক্লাস পাচ্ছে না। একজন শিক্ষককে একসঙ্গে একাধিক শ্রেণির ক্লাস নিতে হয়। এতে শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ছে।
শ্রীনগরের একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকবিহীন অবস্থায় দায়িত্বে থাকা শিক্ষক জানান, প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজকর্মে সমস্যা হচ্ছে। আবার শিক্ষক কম থাকায় পড়াশোনায়ও প্রভাব পড়ছে।
জেলার শিক্ষাবিদরা মনে করেন, শিক্ষক সংকট নিরসনে জরুরি ভিত্তিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা দরকার। অন্যথায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে।
শিক্ষাবিদরা বলেছেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় নেতৃত্ব প্রধান শিক্ষক। শিখন শেখানো ও পরিচালনায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেন তারা। তাদের অনুপস্থিতিতে শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকরা পাঠদানসহ প্রশাসনিক দায়িত্বও সামলাতে গিয়ে অতিরিক্ত চাপ নিতে বাধ্য হচ্ছেন। যার নেতিবাচক প্রভাব পরছে পুরো শিক্ষা ব্যাবস্হার উপর। তারা আশা করছেন পদোন্নতি, সরাসরি নিয়োগ ও তদবিরের মাধ্যমে দ্রুত শূন্য পদ পূরণ হবে। তবে এখন পর্যন্ত বড় অঙ্কের পদ পূরণের নির্দিষ্ট কোনো কার্যক্রম শুরু হয়নি। বেশ কিছু শিক্ষক কোর্টে মামলা ও রিট করার কারণেও প্রধান শিক্ষক নিয়োগে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, শুধু পদ পূরণই যথেষ্ট নয়, নিয়োগ কার্যক্রম দ্রুততর করা ও শিক্ষার মানোন্নয়ন নিশ্চিত করা জরুরি, নতুবা প্রাথমিক শাখার শিক্ষা নেতৃস্থানীয় সংকট অর্জিত শিক্ষার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এ বিষয়ে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে মুন্সীগঞ্জ জেলায় বেশ কিছু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকে নেই। এ কারণে শিক্ষার্থীদের পাঠদানে ভোগান্তি হচ্ছে। তাই শূন্য পদ পূরণের জন্য একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সরকারের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। উচ্চ আদালতে একটি মামলা বিচারাধীন থাকায় এই পদে নিয়োগ সংক্রান্ত কিছুটা জটিলতা রয়েছে। তবে শিগগিরই সৃষ্ট সমস্যার সমাধান করে শুন্য পদে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ করা হবে।