মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলায় ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের পুনর্বাসনের জন্য নির্মিত আশ্রয়ণ প্রকল্পের অধিকাংশ ঘরই পড়ে আছে ফাঁকা। যাঁদের নামে এসব ঘর ও জমির দলিল করে দেওয়া হয়েছে, তাঁদের অনেকেই সেখানে বসবাস করছেন না। কেউ কেউ ঘর ভাড়া দিয়েছেন, আবার কেউ ঘর বিক্রিও করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে প্রকৃত ভূমিহীন ও অসহায় অনেক পরিবার এখনো মাথা গোঁজার ঠাঁই না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালে গজারিয়া উপজেলার ৭টি ইউনিয়নে ১৯২টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর বুঝিয়ে দেওয়া হয়। প্রতিটি ঘর নির্মাণে সরকারের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১লাখ ৭১হাজার টাকা। দুটি শয়নকক্ষ, বারান্দা, রান্নাঘর ও টয়লেটসহ প্রতিটি ঘরে পৃথক বিদ্যুৎ মিটারের ব্যবস্থা রাখা হয়।
ইউনিয়নভিত্তিক ঘরের সংখ্যা হলো, বাউশিয়ায় ৫২টি, গজারিয়ায় ৩২টি, ভবেরচরে ৩০টি, বালুয়াকান্দিতে ২৮টি, গুয়াগাছিয়ায় ২৩টি, ইমামপুরে ১৬টি এবং হোসেন্দীতে ১১টি।
সম্প্রতি উপজেলার বালুয়াকান্দি ইউনিয়নের বড় রায়পাড়া, বাউশিয়া ইউনিয়নের ফরাজিকান্দি, ভবেরচর ইউনিয়নের শ্রীনগর ও ভিটিকান্দিসহ বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আশ্রয়ণ প্রকল্পের অনেক ঘরই তালাবদ্ধ ও জনমানবশূন্য। কোথাও কোথাও ঘরের সামনে আগাছা জন্মেছে, ঝুলে আছে মশারি ও ছেঁড়া কাপড়। দীর্ঘদিন মানুষের বসবাস না থাকায় কিছু ঘর ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। আবার কয়েকটি ঘরে ভাড়াটিয়াদের বসবাস করতে দেখা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বরাদ্দপ্রাপ্তদের অনেকে ঘরে বসবাস না করে অন্যের কাছে ভাড়া দিয়েছেন। কেউ কেউ ঘর বিক্রি করে দিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। অনেক বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তি কয়েক মাস পরপর এসে বিদ্যুৎ বিলের কাগজ নিয়ে চলে যান। দীর্ঘদিন বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ না করায় কয়েকটি ঘরের মিটার খুলে নিয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ঘর বরাদ্দের সময় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপকারভোগীদের উপস্থিতি থাকলেও এক-দুই দিন পর অনেকেই চলে যান। এরপর আর তাঁদের সেখানে দেখা যায়নি। ফলে সরকারি অর্থ ব্যয়ে নির্মিত ঘরগুলো পড়ে থাকলেও প্রকৃত ভূমিহীন পরিবার গুলো পুনর্বাসনের সুযোগ পাচ্ছে না।
আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাসকারী কয়েকজনের অভিযোগ, ঘর নির্মাণের পর থেকেই বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাঁদের। অনেক ঘরের ছাদ দিয়ে বর্ষাকালে পানি পড়ে, মেঝেতে ফাটল দেখা দিয়েছে। কোথাও বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে। পাশাপাশি গ্যাসের অভাব ও চলাচলের রাস্তার বেহাল অবস্থার কারণে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বাসিন্দাদের।
বড় রায়পাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাসকারী এক ভাড়াটিয়া নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমরা ভাড়া দিয়ে এখানে থাকি। এ কথা জানাজানি হলে আমাদের বের করে দেওয়া হতে পারে। যাঁদের নামে ঘর বরাদ্দ রয়েছে, তাঁদের অনেকেই এখানে থাকেন না। অথচ আশপাশে অনেক অসহায় পরিবার রয়েছে, যাদের থাকার মতো নিজস্ব কোনো জায়গা নেই।
আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাসকারী কয়েক জনের অভিযোগ,তারা সরকারি অনুদান, ত্রাণ, শীতবস্ত্রসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। অথচ যাঁদের নামে আশ্রয়ণের ঘর বরাদ্দ রয়েছে, তাঁদের কেউ কেউ নিজস্ব বাড়িঘর ও সম্পদের মালিক।
এ অবস্থায় ভুক্তভোগীরা আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলোর বর্তমান অবস্থা সরেজমিনে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, যেসব বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে ঘরে বসবাস করছেন না, তাঁদের বরাদ্দের বৈধতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারের নতুন তালিকা তৈরি করে অব্যবহৃত ঘরগুলো তাঁদের মধ্যে বরাদ্দ দিতে হবে। সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত এসব ঘরের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ চান স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে গজারিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে হাফসা নাদিয়ার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।