শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
মুন্সীগঞ্জের সময়

শিরোনাম:

● লাইসেন্স-ফি ও অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা কমলে বাড়বে শ্রমিকের মজুরি l ● কম দামের অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িতে সীসার ঝুঁকি, সতর্ক করলেন গবেষকেরা ● অর্থনীতির মূলধারায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর আহ্বান জুবাইদার ● মুন্সীগঞ্জ জেলা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক হলেন লৌহজংয়ের ইসরাফিল শেখ ● জমি বিরোধে বিষ প্রয়োগে কৃষকের ৩ লাখ টাকার ফুলকপির চারা নষ্টের অভিযোগ ● লৌহজংয়ে ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উদযাপনে প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত ● গজারিয়ায় জমি নিয়ে বিরোধ, বৃদ্ধকে পিটিয়ে আহত করার অভিযোগ. ● গজারিয়ায় দুই লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ঘাটলা ছয় বছরেও কাজে আসেনি. ● গজারিয়ায় ৭ নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস পালনে বিএনপির প্রস্তুতি. ● রামপালে সাবেক উপমন্ত্রী আবদুল হাইয়ের আত্মার মাগফিরাত কামনায় মিলাদ ও দোয়া মাহফিল
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

সিরাজদীখানে ৯ হিমাগারে ৬ লাখ ৫২ হাজার বস্তা আলু, লোকসানের শঙ্কা ৪৫ কোটি টাকা

আব্দুল্লাহ আল মাসুদ

প্রকাশ : শুক্রবার, ৬ নভেম্বর,২০২৬, ০৮:৪৬ এ এম
সিরাজদীখানে ৯ হিমাগারে ৬ লাখ ৫২ হাজার বস্তা আলু, লোকসানের শঙ্কা ৪৫ কোটি টাকা

মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখান উপজেলার প্রায় ৯ হাজার কৃষক বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে আলু চাষ করেছিলেন। ফলনও হয়েছিল ভালো। তাঁদের চোখে ছিল বাড়তি লাভের প্রত্যাশা। সেই আশায় অনেক কৃষক ও ব্যবসায়ী উৎপাদিত আলু সরাসরি বিক্রি না করে সংরক্ষণ করেছিলেন হিমাগারে। ভেবেছিলেন, মৌসুমের পর বাজারে দাম বাড়লে ভালো মুনাফা পাবেন। কিন্তু তাঁদের সেই স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। বাজারে আলুর দাম না বাড়ায় হিমাগারে মজুত রাখা আলু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন তাঁরা।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে ফয়েজ ও নাহার কোল্ড স্টোরেজ ঘুরে দেখা গেছে, হিমাগার দুটিতে এখনো বিপুল পরিমাণ আলু মজুত রয়েছে। বাজারে দাম কম থাকায় ব্যবসায়ীরা এসব আলু বের করতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ৯টি সচল হিমাগারে এখনো ৩২ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন বা ৬ লাখ ৫২ হাজার বস্তা আলু মজুত রয়েছে। উৎপাদন ও সংরক্ষণ খরচ মিলিয়ে ৫০ কেজির প্রতি বস্তা আলুর ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯৮০ টাকা। অথচ বর্তমানে শ্রমিকের মজুরি ও গাড়িভাড়াসহ বাজারে বিক্রি করতে গিয়ে প্রতি বস্তায় পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩০০ টাকা। এতে বস্তাপ্রতি প্রায় ৬৮০ টাকা লোকসান হচ্ছে। সব মিলিয়ে মজুত আলু বিক্রি করতে গেলে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের প্রায় ৪৪ কোটি ৩৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে।

আলুর দরপতনে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। তাঁদের সারা বছরের শ্রম, বিনিয়োগ আর পরিবারের সচ্ছলতার স্বপ্ন এখন বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে। ভালো দাম পাওয়ার আশায় মাসের পর মাস হিমাগারে আলু রেখে দিয়েছেন অনেকে। কিন্তু প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ায় এখন উৎপাদন ও সংরক্ষণ খরচও তুলতে পারছেন না। নতুন মৌসুমের চাষাবাদ সামনে থাকায় পুরোনো আলু নিয়ে তাঁদের দুশ্চিন্তা আরও বেড়েছে।

নভেম্বরের শেষ দিকে নতুন করে জমিতে আলু রোপণ শুরু করবেন কৃষকেরা। অন্যদিকে আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে হিমাগার থেকে পুরোনো আলু বের করার সময়সীমা রয়েছে। কিন্তু বর্তমান বাজারদরে হিমাগার থেকে আলু বের করে বিক্রি করলে ৫০ কেজির প্রতি বস্তায় প্রায় ৬৮০ টাকা লোকসান হচ্ছে। ফলে লোকসানের আশঙ্কায় অনেক ব্যবসায়ী হিমাগার থেকে আলু বের করতে চাইছেন না। এতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হিমাগার খালি করা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, গত বছর সিরাজদীখানে ৮ হাজার ৯৫৮ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছিল। উৎপাদন হয়েছিল ৩ লাখ ২ হাজার ৭৫ মেট্রিক টন। উৎপাদন মৌসুমে অনেক কৃষক জমি থেকেই আলু বিক্রি করেন। তবে বেশি লাভের আশায় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের একটি অংশ আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করেন।

হিমাগারগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার ফাইভ স্টার কোল্ড স্টোরেজে ৬ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন, শবনম কোল্ড স্টোরেজে ২ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন, নাহার কোল্ড স্টোরেজে ১ হাজার ৭৫০ মেট্রিক টন, নেপচুন কোল্ড স্টোরেজে ২ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন, মডেল কোল্ড স্টোরেজে ২ হাজার ১৫০ মেট্রিক টন, সম্রাট কোল্ড স্টোরেজে ৫ হাজার ২৫৫ মেট্রিক টন, আনাম কোল্ড স্টোরেজে ৪ হাজার ৬৪৮ মেট্রিক টন, শাহজালাল কোল্ড স্টোরেজে ৪ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন এবং ফয়েজ কোল্ড স্টোরেজে ৩ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন আলু সংরক্ষিত রয়েছে। এ ছাড়া ইছাপুরা এলাকার হাসান কোল্ড স্টোরেজটি যান্ত্রিক সমস্যার কারণে বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বীজ, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরিসহ মাঠ থেকে হিমাগারে পৌঁছানো পর্যন্ত ৫০ কেজির প্রতি বস্তা আলুতে খরচ হয় প্রায় ৬০০ টাকা। এর সঙ্গে খালি বস্তার দাম ৮০ টাকা এবং হিমাগারে সংরক্ষণ খরচ ৩০০ টাকা যোগ করলে মোট ব্যয় দাঁড়ায় ৯৮০ টাকা। অথচ বর্তমানে হিমাগার থেকে আলু বের করে শ্রমিকের মজুরি ও গাড়িভাড়া দিয়ে বাজারে বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৩০০ টাকায়। এতে হিসাব অনুযায়ী বস্তাপ্রতি লোকসান হচ্ছে ৬৮০ টাকা।

লতব্দী ইউনিয়নের আলু ব্যবসায়ী মাহবুব হোসেন রন্টু জানান, গত বছর তিনি নাহার, নেপচুন ও সম্রাট নামে তিনটি হিমাগারে ৮ হাজার বস্তা আলু সংরক্ষণ করেছিলেন। এর মধ্যে এক হাজার বস্তা বিক্রি করেছেন। এখনো ৭ হাজার বস্তা আলু মজুত রয়েছে। বর্তমান বাজারদরে এসব আলু বিক্রি করতে গেলে প্রতি বস্তায় প্রায় ৭০০ টাকা লোকসান হচ্ছে। সব হিসাব মিলিয়ে প্রায় ৫০ লাখ টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন তিনি।

বয়রাগাদী ইউনিয়নের গোবরদী গ্রামের কৃষক ইয়াসিন শেখ জানান, তিনি নাহার কোল্ড স্টোরেজে ৭ হাজার বস্তা আলু রেখেছিলেন। এর মধ্যে ৪ হাজার বস্তা লোকসানে বিক্রি করেছেন। এখনো ৩ হাজার বস্তা আলু পড়ে আছে। বর্তমান বাজারে এসব আলু বিক্রি করলে প্রায় পুরোটাই লোকসান হবে।

সন্তোষপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ইসমাইল খন্দকার বলেন, তিনি বৃহস্পতিবার সিরাজদীখান বাজার থেকে প্রতি কেজি ২০ টাকা দরে ৫ কেজি আলু কিনেছেন। কৃষকেরা লোকসানে থাকলেও খুচরা ব্যবসায়ীরা ভালো লাভ করছেন।

ফয়েজ কোল্ড স্টোরেজের ব্যবস্থাপক শাহ আলম জানান, গত বছর তাঁদের হিমাগারে ১ লাখ ৫ হাজার বস্তা আলু সংরক্ষণ করা হয়েছিল। এখনো ৭০ হাজার বস্তা আলু অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে। আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে হিমাগার খালি করার কথা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। আলুর দাম কমে যাওয়ায় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি হিমাগার কর্তৃপক্ষও লোকসানের আশঙ্কায় রয়েছে। প্রতি বস্তায় ৩০০ টাকা সংরক্ষণ ভাড়া দিয়েও ব্যবসায়ীরা হিমাগার থেকে আলু নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।

নাহার কোল্ড স্টোরেজের ব্যবস্থাপক আরশাদ হোসেন বলেন, বাজারে আলুর দাম ক্রমাগত কমে যাওয়ায় কৃষক ও হিমাগারমালিক—উভয় পক্ষই লোকসানের মুখে পড়েছেন। তাঁদের হিমাগারে এখনো প্রায় ৩৫ হাজার বস্তা আলু মজুত রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী আগামী মাসের মধ্যে ব্যবসায়ীদের এসব আলু হিমাগার থেকে নিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও লোকসানের আশঙ্কায় কেউ আলু নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।

সিরাজদীখান উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, অনুকূল আবহাওয়ার কারণে গত বছর আলুর উৎপাদন বেশি হয়েছিল। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়ায় প্রতিবছরই কৃষকদের লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কাজ করছে। স্থানীয় জাতের পরিবর্তে রপ্তানিযোগ্য জাতের আলু চাষে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

সম্পর্কিত

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)